১
কাজ থেকে বাড়ি ফিরেছে সাধন। তার পায়ের আওয়াজ দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে যখন ঘরের ভিতর , মুখ তুলে তাকায় কুসুম। ধীর পায়ে এসে ঝপ করে খাটিয়ায় বসে পড়ে মানুষটি। কেমন যেন লাগে তাকে। চোখ সিলিং ফ্যানের দিকে, মুখে কোনও কথা নেই i কুসুম তখন সবে উনোন থেকে সব্জির কড়া নামিয়ে রুটির আটা মাখছিল i সাধনকে ওই রকম নিশ্চুপ বসে থাকতে দেখে তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে এক গ্লাস জল নিয়ে এগিয়ে আসে। ফ্যান চলছে ঘড় ঘড় আওয়াজ করে বেশ জোরেই i তাও ঘামছে মানুষটা i আতঙ্কিত হয়ে পড়ে কুসুম। কি হলো? কিছু অঘটন ঘটেছে নাকি? সুস্থ শরীরেই তো কাজে বেরিয়েছিলো i
গামছা দিয়ে মুখ গলার ঘাম মুছে আস্তে আস্তে বলে সাধন কাল থেকে কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঠিকাদার বলল সে নিরুপায় আর কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। তার মানে রোজগার ও বন্ধ i সাধন পেশায় একজন রাজ মিস্ত্রি i
করোনা নামের যে ছোঁয়াছুঁইর রোগে বিদেশে অনেক লোক মারা যাচ্ছে , সেটা এখন আমাদের দেশেও ঢুকে পড়েছে i বিস্তর লোক মারা যাচ্ছে। বেশ কয়েকদিন থেকে লোকজন বলাবলি করছিলো । সেটাই সত্য হলো । সাধন বলে মানুষের সাথে মানুষের ছোঁয়া বাঁচাতে আগামী কাল থেকে লক ডাউন হচ্ছে i সে আবার কি?! আতঙ্কিত কুসুমের মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে প্রশ্ন i সাধন বলে শুনলাম সবাইকে ঘরের ভিতরে আটকে থাকতে হবে। বাইরে বেরোনো যাবে না। রাস্তায় কোনও যানবাহনও চলবে না i সমস্ত রকম অফিস বন্ধ থাকবে। এমন কি স্কুল কলেজ পর্যন্ত খোলা থাকবে না ।
কুসুম সাধনের পাশে এসে বসে এবার। খুব অদ্ভুত একটা খারাপ সময় আসছে সে বুঝতে পারে। এখন শক্ত থাকা দরকার। বলে এই রোগ বেশিদিন থাকবে না। আবার সব ঠিকঠাক চলবে দেখো। তাছাড়া বুধন কাজে লেগে গেছে তার মাইনেটাও তো আছে। আমাদের ঠিক চলে যাবে। কুসুমের কথায় কিছুটা নিশ্চিত হয়ে তার হাত থেকে জলের গ্লাসটা নিয়ে ঢক ঢক করে গলায় ঢালে সাধন। এবার ছেলের জন্য চিন্তা হয় তার । সে বাড়ি ফেরেনি এখনও।
কিছুদিন হলো বুধন অফিস পাড়ার একটা চায়ের দোকানে কাজ করে ভালই রোজগার করছে। তাদের ওই একটি মাত্র ছেলে। কিন্তু এই স্বস্তি বেশিক্ষণ টিকলো না। কাজ থেকে মুখ অন্ধকার করে বাড়ি ফিরলো বুধন i সব অফিস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আগামীকাল থেকে। বাবুরা কাজে না এলে চা খাবে কে? তাই মালিক কাল থেকে দোকানে যেতে মানা করেছে i বকেয়া মাইনের টাকা হাতে ধরিয়ে বিদায় দিয়েছে তাকে।
শ্রমিক বস্তির সব হল্লা হঠাৎ থেমে গেছে। সারাদিন কিছু না কিছু নিয়ে হল্লা লেগেই থাকে এখানে। এখন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে সারা মহল্লা। সবার মুখে আতঙ্কের ছায়া i বিপদে পরামর্শ নিতে সবাই সাধনের কাছে আসে। সেইই যখন অসহায় হয়ে চুপ করে গেছে আর ভরসার জায়গা কোথায়?
২
অসময়ে কলিং বেলের আওয়াজ শুনে একটু অবাক হয় কাবেরী। এই সময়ে কে এলো। রমেন পাল অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা তাসের আড্ডায় চলে যান। ছেলেও একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে। ফিরতে রাত হয়। এত তাড়াতাড়ি সে বাড়ি ফিরবে না। তাহলে এই সময়ে এত অস্থির ভাবে বেল বাজাছে কে? দরজা খুলে অবাক কাবেরী । রমেন বাবু হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে রিমোট নিয়ে চেনেল পাল্টাছেন। কাবেরী সিরিয়াল দেখেন এই সময়েটায়। এত দিন শাশুড়ি বউমা এক সাথে বসে দেখতেন। দু মাস আগে শাশুড়িমা গত হওয়ার পর একাই দেখতে হয়। ঝড় বৃষ্টি যত অনর্থই হয়ে যাক তার স্বামী তাসের আড্ডা ফেলে এসময়ে বাড়ি ফেরেন না। আজ তার কি হলো!
টিভিতে করোনা রোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। খবরে বলছে কাল থেকে পনেরো দিনের লকডাউন ঘোষণা হয়েছে। সরকার রোগ প্রতিরোধে সব রকম ব্যবস্থা নিচ্ছে। জনসাধারনকেও সাবধানে থাকতে হবে। নাহলে প্রয়োজনে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রিমোট স্ত্রীর হাতে ধরিয়ে তাকে মাসের বাজারের একটা ফর্দ তৈরি করতে বলে রমেনবাবু বাথরুমে ঢুকলেন। মুদির দোকান বন্ধ হয়ে গেলে মুস্কিল হয়ে যাবে। চাল ডাল তেল মশলা আরও কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস এক্ষুনি কিনে রাখতে হবে। কাবেরী রান্না ঘরে টুকটাক কাজ করছে। কেমন একটা আতঙ্ক হচ্ছে তার। বিদেশে এই রোগে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে শোনা যাচ্ছিলো। এবার কি তাদের পালা ?একটা অজানা বিপদের আশঙ্কায় বুক কাঁপে। মাসের প্রায় শেষ দিক। মোটামুটি একটা ফর্দ তৈরি করে স্বামীর হাতে ধরালেন তিনি। এক কাপ চা খেয়ে বাজারের থলে নিয়ে মুদির দোকানে রওনা হলেন রমেনবাবু। দোকানে লম্বা লাইন। দুজন লোক হিমশিম খাচ্ছে খদ্দের সামলাতে। কাবেরী যা ফর্দ দিয়েছিলো তার অর্ধেক জিনিস দোকানে পাওয়া গেল না। লাইনের পিছন দিকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ জন গণ্ডগোল আরম্ভ করলো। তারা চিৎকার করছে কবে পাওয়া যাবে দোকানের মালিক বলুক। দোকানদার মাথা নেড়ে বললো হোলসেল বাজারেও পাওয়া যাচ্ছে না। আমি কি করবো বলুন? কিছু লোক বাড়িতে প্রচুর মজুত করে ফেলাতে সঙ্কট আরো বেড়েছে।
দোকান থেকে ফেরার পথে মনে মনে হিসাব কষে রমেনবাবু দেখলেন ঘরে টাকাও বিশেষ নেই, মাসের শেষ। ব্যাংক থেকে কিছু টাকা তুলে ঘরে রাখতে হবে। বিপদ কখন ঘাড়ে এসে পরে ঠিক নেই। টাকা হাতে থাকলে তাও মনে একটু জোর পাওয়া যায়।
৩
পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে I দেশে দফায় দফায় লকডাউন চলছেই i একপ্রস্ত লক ডাউন শেষ হওয়ার পর মানুষ আশা করছে এবার কাজ আরম্ভ হবে। সব আগের মতো চলবে । কিন্তু কয়েকটা দিনের শান্তি। আবার আরেক দফা লক ডাউন শুরু হচ্ছে। সবার জমানো টাকা তলানিতে। কাজ কর্ম বন্ধ রোজগার হবে কি করে ? দিন মজুরিতে কাজ করা লোকগুলোর অবস্থা আরো সঙ্গীন। সরকারের তরফ থেকে শঙ্খ বাজাতে বলা হয়েছিলো। হাততালি দিতে আদেশ করা হয়েছিলো। বস্তির বিপন্ন মানুষ ঢাক ঢোল পিটিয়ে তাই করেছে। এ যেন আবার আদিম যুগে ফিরে যাওয়া। আদিম যুগে মানুষ যেমন দেবতাকে তুষ্ট করে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করতো এ তেমনি একটা ব্যবস্থাl এই অদ্ভূত নতুন রোগের ওষুধ কি কেউ জানে না। বিনা চিকিৎসায় অসহায় ভাবে মানুষ মরেই চলেছে। বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন কিন্তু ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। মৃত্যু ভয়ে ঘরে আটকে থাকছে মানুষ।
কাজ কর্ম আরম্ভ করা যাচ্ছে না। আশা ভরসা হারিয়ে সবার চোখে শুধু আতঙ্ক। ঘরের মেঝেতে বসে কাঁদছে কুসুম। হাত খালি হয়ে গেছে আর উপায় নেই।আবার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে হবে তাদের। গ্রামের প্রতিবেশীদের ফোন করেছিল সাধন। সেখানে মাটির ঘর ভেঙে পড়েছে। আগাছা সাপ খোপের বাসা হয়েছে। কি করে যেখানে গিয়ে থাকবে। তবুও নিজের ভিটে। আশ্রয় বলতে এখন সেটাই। রেল গাড়ী চলছে না। রাস্তায় যান বাহন নেই। হেঁটেই যেতে হবে গ্রাম পর্যন্ত এতটা রাস্তা। পথ হারিয়ে ফেলবে না তো?! মুর্শিদাবাদ পৌঁছুতে পারবে তারা? আশংকায় বুক কাঁপে সবার। পুটুলিতে কাপড় চোপড়, খানিকটা চিঁড়ে বেঁধে নিয়ে কাল মুর্শিদাবাদের হাঁটা পথ ধরবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাধন দলের অন্যান্যদের সাথে আলোচনা করে। এই রোগের অস্ত্র মাস্ক কেনার সামর্থ নেই। তাই সবাই মুখ বেঁধে নেবে ছেঁড়া কাপড়ে।
৪
বড় বড় শহর গুলো যেন পরিত্যক্ত মনে হয়। জন মানব শূন্য রাস্তা খাঁ খাঁ করছে। মাঝে মাঝে দু একটা সরকারি বাস ছাড়া যানবাহন প্রায় নেই বললেই চলে। সারা দেশের শহর গুলোর রাস্তা জনশূন্য। গিজগিজে ভিড়ের কলকাতার রাস্তাও এখন জন শূন্য। শুধু মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে শ্রমিকের দল। তারা হেঁটে তাদের গ্রামে ফিরছেন। চার বন্ধু মিলে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে কোনোমতে অফিস করছেন রমেন পাল। মাইনের একটা বড় ভাগ বেরিয়ে যাচ্ছে অফিসে যাওয়া আসাতেই। এর মধ্যে পরিচিত জনের মৃত্যুর খবর প্রায় প্রতিদিনই আতঙ্ক তৈরি করছে। বিষণ্ণ মনে শুধু দিন কাটিয়ে যাওয়া। একসাথে খেলে বড় হয়েছেন ছোট্ট বেলার বন্ধু পার্থসারথি করোনায় মারা গেলেন। তার পাশে দাঁড়ানো তো দূর, বাড়িতেও ঢুকতে পারলেন না রমেন বাবু। দরজার পাশে খাবার, ওষুধ রেখে এসেছেন দিনকয়। তারপর সেই যে হাসপাতালে গেল পার্থ আর দেখা হলোনা। শেষ যাত্রায় সাদা প্যাকেটে শুধু একটা নম্বর হয়ে একা চলে গেল পার্থ। ছেলেরা বাপের মুখাগ্নিটুকুও করতে পারেনি। শুনেছেন প্রতিবেশীরা পরিবারটিকে এক ঘরে করে রেখেছিলো। আতঙ্কে মানুষ মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছে।
আইটি সেক্টরে কাজ করে ছেলে অভিক। ভাগ্য ভালো তাকে বাইরে বেরিয়ে অফিসে করতে হচ্ছে না। ঘরে বসে অফিসের কাজ। Work from home কাজের এই ধরন নতুন দেখছে দেশ। অভিক বললো বেতন কমিয়ে অর্ধেক করবে কোম্পানি আগামী মাস থেকে। বিশাল বিশাল শপিং মল সব বন্ধ । রেলের সাথে যুক্ত হাজার হাজার মানুষ কাজ হারিয়ে ঘরে বসে আছে। আরো কত রকমের কাজ বন্ধ তার হিসেব করা মুস্কিল।
৫
মাথার উপর সূর্য আগুন ঢেলে দিচ্ছে। পোঁটলা-পুঁটলি , শিশু, বৃদ্ধ মা-বাবা সঙ্গে নিয়ে তীব্র গরমে প্রায় ছায়াহীন রাস্তায় হাঁটছে শ্রমিক। কাজ হারিয়ে, আশ্রয় হারিয়ে অবিশ্রাম হেঁটে যাচ্ছে, এক দিন বাড়ি পৌঁছে যাবে এই আশায়। কোন উপায় নেই । অনেক কষ্টে যে কটা টাকা বাঁচিয়ে রেখেছিলো শেষ সম্বল। সেটাও তলানিতে। এক মাত্র হেঁটে দেশে ফেরা ছাড়া গতি নেই। রোগ থেকে বাঁচতে কাজ বন্ধ করেছে সরকার। কিন্তু রাস্তায় পড়ে অনাহারে নিরাশ্রয় মৃত্যু ঠেকাবে কে?
বাচ্চারা খিদের জ্বালায় অনেকক্ষন থেকে কাঁদছে। তাই দল ছুট হয়ে সাধন গেছিলো খাবারের সন্ধানে। আর ফেরেনি। দলের লোকেরা বলছে পুলিশের তাড়া খেয়ে হয়তো রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে। তারা আর অপেক্ষা করতে রাজি হয়নি। কুসুম একদিন ছেলে নিয়ে সাধনের অপেক্ষায় পথের আসে পাশে লুকিয়ে বসে ছিলো। সাধনকে রাস্তায় ছেড়ে কি করে সে ছেলে নিয়ে চলে যাবে? কিন্তু পথে বসে থাকার উপায় নেই। পুলিশ বসে থাকতে দেখলেই লাঠি নিয়ে তাড়া করছে। দৌড়ে ছেলের হাত ধরে পালাতে গিয়ে কাপড়ের পুঁটুলিটাও কোথায় পরে গেল। নিঃসম্বল হয়ে রাস্তায় কুসুমকে ছোটাছুটি করতে দেখে আর এক দলের মানুষ তাকে সঙ্গে করে নিয়ে চলেছে। কুসুমকে দিশাহারা হয়ে পথে কাঁদতে দেখে তারা বুঝিয়েছে সাধন ঠিক রাস্তা খুঁজে মুর্শিদাবাদ পৌঁছে যাবে। রাস্তায় বসে থেকে ছেলে শুদ্ধ কুসুম মারা যাবে। কুসুম কাঁদে। তার ধুলো ভরা গাল বেয়ে চোখের জল ধুলোতেই মিশে যায়। রোদ, ঘাম বৃষ্টিতে সস্তা কাপড় ছিঁড়ে ফেটে গেছে। কোনোমতে লজ্জা নিবারণ করে হেঁটে চলে। পথে কিছু কিছু জায়গায় খাবার আর জল দিচ্ছে কিছু লোক। তাই হাত পেতে নিয়ে পেট ভরছে এই শ্রমিকের দল। বুধন আর হাঁটতে পারছে না। বাবার জন্য কেঁদে কেঁদে , সে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার উপর অনাহার। মাঝে মাঝেই রাস্তায় বসে পড়ছে সে। তেরো বছরের ছেলেকে কোলে নিয়ে হাঁটা সম্ভব নয় কুসুমের পক্ষে। দলের লোকেরা সান্ত্বনা দেয় কাছেই কলকাতা । পৌঁছুতে পারলে খাওয়া থাকার একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই হবে। পরের দিন মুর্শিদাবাদ রওনা হলেই হবে। আশা পেয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে বুধন I তার হাওয়াই চটি ছিঁড়ে গেছে অনেকক্ষণ।
গরম রাস্তায় খালি পা ফেটে রক্ত ঝরছে। খবর ভাসে রাস্তায় সন্তান প্রসব করছে নারী। পরিশ্রম সইতে না পেরে বৃদ্ধ মানুষ রাস্তাতেই প্রাণ দিচ্ছে। নিরুপায় মানুষ প্রিয়জনের দেহ সৎকার করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে শোকের পাথর বুকে নিয়ে।
৬
ছোটো বেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর অনেক যুদ্ধ করে রমেন পালকে মানুষ করেছেন মাকয়েক বছর আগের কথা । একটা ভয়াবহ অতিমারী দেখেছিল সারা পৃথিবী। অতিমারী পৃথিবীতে নতুন নয়, এর আগেও আতিমারি, মহামারী হয়েছে। কিন্তু সেটা আক্রান্ত একটি দেশেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এবারের অতিমারীর ব্যাপকতা অনেক বিশাল । কারণ বিশ্বায়নের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা এই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে মানুষ অনায়াসে এক দেশ থেকে আর এক দেশে একদিনের মধ্যেই চলে যেতে পারছে। এই ব্যবস্থায় কভিড 19 মত ছোঁয়াচে রোগ প্রতিরোধ করা অত্যন্ত কঠিন । একটা নতুন রোগ পৃথিবী দেখেছে।যার চিতিৎসা সঠিন ভাবে করা যাচ্ছিলো না। কারণ সঠিক ওষুধ আবিষ্কার হয় নি। এ যেন একটা বিশ্ব যুদ্ধ।
পৃথিবীর মানুষ দুটো বিশ্ব যুদ্ধ দেখেছে। কিন্তু সে দুটো ভয়াবহ যুদ্ধেও এত মানুষ মারা যায়নি যেটা এই অতিমারিতে ঘটেছে। এত প্রাণনাশ।
হাজার হাজার ঘর উজাড় হয়ে গেছে। বিশাল সংখ্যায় শিশুরা মা বাবাকে হারিয়ে অনাথ হয়েছে। অসংখ্য ডাক্তার স্বাস্থ্য কর্মীকে হারিয়েছি আমরা। কর্মহীন অসহায় মানুষের কান্নায় বিষন্ন আতঙ্কিত করে তুলেছে চারদিক।
মূলত কর্মচুত শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থাই কিছুটা তুলে ধরা হয়েছে এই কথকতায়। শ্রমিক, শ্রমের বিনিময়ে মূল্য বুঝে নেওয়ার উপরেই যাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে। যারা গড়ে তোলে দেশ, সমাজ,শিল্প । মানুষের বাসস্থান। তারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় “ সভ্যতার পিলসুজ”।
মায়ের মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরী হয়েছে সেটা কোনদিন পূরণ হবার নয়।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি দেখে মনে হয় রমেন বাবুর উপরওয়ালার বিচার আছে। মঙ্গলই করেছেন ঈশ্বর। তার যুদ্ধ ক্লান্ত মাকে এই দিন দেখতে হয়নি। পাড়ায় পাড়ায় ত্রাণের ব্যবস্থা হয়েছে। পাড়ার লোকেরা যার পক্ষে যতটা সম্ভব দান করছেন। গরিব মানুষ গুলোর বিক্রি করার মতো ঘটি বাটিও আর অবশিষ্ট নেই। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। রমেন এবং তার স্ত্রী দুজনেই ঠিক করেছেন মায়ের শাড়ি কাপড় যা রয়েছে সব এই ত্রাণেই দিয়ে দেবেন। সেসব গোছ গাছ করতে গিয়ে আলমারির এক পাশ থেকে চাদরটা বেরিয়ে পড়লো। চাকরি পেয়ে প্রথম মাসের মাইনে দিয়ে এই চাদরটা মাকে কিনে দিয়েছিলেন রমেন বাবু। মায়ের বড় প্রিয় ছিল এই চাদর। যত্ন করে রেখেছেন যতো দিন বেঁচে ছিলেন। চাদরটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন রমেন পাল। কাবেরীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। চাদরটা স্বামীর হাত থেকে নিয়ে রেখে দিতে চাইলেন। শাশুড়ির স্মৃতি। রমেন বাবু স্ত্রীর হাত থেকে চাদরটা নিয়ে পুঁটলিতে বাঁধলেন। আজ রাতের মধ্যেই এগুলো পৌছে দিতে হবে পাড়া কমিটির কাছে। কাল সকালে বিলি করা হবে।নোটিশ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ত্রাণের পুঁটলি হাতে পাড়ার ক্লাবঘরের দিকে রওনা হলেন রমেন পাল। গলির মাথায় কিছুটা জায়গায় রাস্তাটা অন্ধকার হয়ে আছে অনেকদিন থেকে। বাতিটা খারাপ হয়ে গেছে। ঠিক করার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়নি কেউ ।
আসে পাশের ফ্ল্যাট থেকে কিছুটা আলো এসে পড়েছে রাস্তায় । তাতে মোটামুটি আবছা একটু আলো হয়েছে । উল্টো দিক থেকে একদল মানুষ আস্তে আস্তে হেঁটে এগিয়ে আসছে দেখতে পেলেন তিনি। কাছাকাছি হতেই একটা কান্নার আওয়াজ কানে এলো রমেনবাবুর। এক টানা ফুঁপিয়ে কাদঁছে এই দলের কেউ । এবার ঠাউর করে দেখলেন একটা বাচ্চা ছেলে এক মহিলার পিছনে লুকোতে চেষ্টা করছে । কান্নাটা আসছে ওখান থেকেই । মহিলা বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরতে চেষ্টা করছে আর বিলাপ করছে বুধন রে , বাপ আয় আমার কোলে আয়। ছেলেটির প্যান্টটা ছিঁড়ে খুলে পড়ে গেছে । কোমরে একটা রশি ঝুলছে । নিজের শতছিন্ন কাপড়ে মা ছেলের লজ্জা ঢাকতে পারছে না । একটা তীব্র কষ্টে বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠলো রমেন বাবুর । কাঁপা কাঁপা হাতে তিনি সঙ্গের পুঁটলি হাতড়াছেন। মায়ের চাদরটা কোথায় ? চাদর দিয়ে ছেলেটাকে ঢেকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। ঝাপসা চোখে তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে অশ্রু রুদ্ধ কণ্ঠ চিরে ডেকে উঠলেন মা ।
ত্রান নিয়ে কমিটির অফিসে আর যাওয়া হলো না তার । এই দলের মধ্যেই সব কাপড় বিলিয়ে দিলেন । শুনলেন এরা সবাই শ্রমিক । দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দল বেঁধে বাড়ি ফিরছে । সব হারিয়ে ভিখিরি তে পরিণত হয়েছে । কোনোদিন কাজ পাবে সেই ভরসাও হারিয়ে ফেলেছে । ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর মানুষগুলোকে পাড়ার দোকান থেকে চিঁড়ে মুড়ি, জল কিনে খাওয়ালেন তিনি । কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটা দিলো তারা। আর রমেনবাবু বাড়ি ফিরে এলেন । সারা রাত ভালো ঘুম হলনা তার । বিছানায় এপাশ ওপাশ করে রাত কাটছে। খুব অস্থির হয়ে রয়েছেন তিনি।
পরদিন অফিসে গিয়ে সহকর্মীদের বললেন কাল রাতের অভিজ্ঞতা। সবাই এক কথাই বলছে সারা দেশের শ্রমিক আজ রাস্তায় । তাদের অবর্ণনীয় কষ্ট টিভিতে দেখে সহ্য করা যাচ্ছে না ।
অফিসে ছুটির পর বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছেন রমেন পাল । বাড়ি ফিরতে হবে। বাস এসে গেছে । উঠতে গিয়েও কি ভেবে ফিরে এলেন তিনি । রাস্তা পার হয়ে উল্টো দিকের একটা বাসে চেপে বসলেন । ট্রেড ইউনিয়ন অফিসের দিকে চললেন আজ। অনেক দেরি হয়ে গেছে । আর না । শ্রমিককে ভিখিরি হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে ওখানেই যেতে হবে তাকে । রমেন পাল তার গন্তব্য ঠিক করে নিলেন ।
