দামোদর যখন খবরটা শুনলো তখন সবে প্রথম রাউন্ড চা দেওয়া শেষ করেছে বাবুদের। গ্যাসে ডাল চাপিয়ে আয়েস করে বিস্কুটটা ডুবিয়েছে চায়ের কাপে তখনই অজয় এসে খবরটা দিলো। জ্যাঠামশাই এর হিক্কা উঠে গেছে। যে কোনো সময় ঘটে যেতে পারে যেকোনো অঘটন। গ্রামের বিষয় আসয়ের হিসাব, ক্ষেতের ফসলের ভাগ বাটোয়ারা , বাস্তু সম্পত্তি সব কিছুর দেখা শোনা উনিই করতেন। কাজের লোকজন আছে কিন্তু সবার উপরে ছিলেন তিনি । জেঠিমা গত হয়েছেন সে অনেক কাল। এই নিঃসন্তান দম্পতির কোন উত্তরাধিকারী নেই । কিন্তু জ্যাঠামশাই গত হওয়ার পর কি গোল বাঁধবে ব্যাপারটা বেশ চিন্তার । বিষম গন্ডগোলের আশঙ্কার অস্থির হয়ে উঠলো দামোদরের মন। জ্ঞাতি গুস্টি তো কিছু কম নেই । সম্পত্তি নিয়ে খোয়াখোয়ী লেগেই আছে । সব সামলে চলতেন ওই একজন। জ্যাঠামশাই। তাকে সবাই সম্মান করে, মানে। উনার বিচার বুদ্ধির উপর ভরসা করা যায়।
অজয় আর রাজুর উপর ক্যান্টিনের ভার দিয়ে গ্রামে রওনা হয় দামোদর। যা হোক করে সামলে নিক দুজনে। রাজুটা ভালোই কাজ শিখে নিয়েছে এখন। রাজুর বাবা মুনিশ খাটতো দমোদরদের ক্ষেতেই। হঠাৎ মারা গেল ডেঙ্গু জ্বরে । চারটি সন্তান নিয়ে তার মা তখন অথৈ জলে । রাজুকে শহরে এনে ক্যান্টিনের কাজে লাগিয়ে দেয় দামোদর । তাও হয়ে গেল বছর তিনেক ।
টালিগঞ্জ থেকে অটো যায় বেহালা । সে দিকেই হাঁটা দিলো সে। গ্রাম কি তার এখানে, টালিগঞ্জ থেকে আগে বেহালা যেতে হবে তাকে । তারপর সেখান থেকে বাস ট্রেকার যা পাওয়া যায় উঠে পড়তে হবে । বাকরাহাট পৌঁছে সেখান থেকে মোহনপুর সেইও অনেকটা পথ। উৎকণ্ঠায় যেন আরও দীর্ঘ মনে হচ্ছে । চার বার যানবাহন পাল্টে , খানিকটা হেঁটে যখন বাড়ী পৌঁছলো তখন দূর থেকে কান্নার রোল শোনা যাচ্ছে। উঠোনে জ্যাঠামশাই এর দেহ শোয়ানো। চোখে কানে তুলসী পাতা । কপালে চন্দন সব হয়ে গেছে । মৃত্যুর আগে কিছু বলে গেছেন কিনা এখন সেই দুশ্চিন্তা হলো দামোদরের । তাই বেশ উচ্চ স্বরে কাঁদতে কাঁদতে জ্যাঠামশাই এর পায়ের উপর ঝাপিয়ে পড়লো দামোদর ।কিন্তু চারধারে তীক্ষ্ণ নজর রেখে বুঝতে পারলো কাউকে কিছু বলে তিনি গত হননি । যাক কিছুটা নিশ্চিন্ত।
শেষকৃত্য থেকে ধড়াচূড়া গ্রহণ কোনো নিয়মই বাদ পড়লো না । শ্রাদ্ধ শান্তি শেষ হাওয়ার পর সম্পত্তি নিয়ে আলোচনা আরম্ভ হলো। বয়োজ্যেষ্ঠ কিছু লোকজন এসেছেন । তাদের উপস্থিতিতে আলোচনা চলছে । পরিবারের ভিতরও রাজনীতি তুঙ্গে । খুব বুদ্ধি করে চলতে হচ্ছে । এদিকে অজয় বার বার খবর নিচ্ছে কবে ফিরবে দামোদর । নিজের বড় মেয়ের সাথে অনেক চিন্তা ভাবনা করে বিয়ে দিয়েছিলো অজয়ের । কিন্তু তার রোজগার পাতির কোনও চিন্তা নেই সেও শ্বশুরের উপর নির্ভর করেই চলে । তাও জামাই মানুষ। মেয়ের সুখের কথা ভেবে তাকে কড়া করে কিছু বলতে পারেনা দামোদর । তার স্ত্রী এবং আরো দুটো মেয়ে থাকে এই গ্রামের বাড়িতেই । চিন্তা কি তার একটা, তাদের গতিও তো করতে হবে । মেজ মেয়েটার বিয়ের কথা বার্তা চলছিলো। এখন পিছিয়ে গেল খানিকটা । প্রায় ঠিক হয়ে যাওয়া বিয়ে পেছানো ভালো কথা নয় ।কর্তা গিন্নি বসে সে সব আলোচনা হচ্ছিলো । কপালে যা আছে হবে । যার যেমন কপাল।
বিকেলে একটু গ্রামের দিকে বেরিয়েছিল দামোদর । প্রতিবেশীদের সাথে যোগাযোগ রাখা , তাছাড়া সে তো এই গ্রামেরই মানুষ । কাজের ধান্দায় গ্রাম ছাড়া বলে টানটা তো চলে যায় না ।কত পরিচিত লোকজন আছে এখানে। দেখা হলে দুটো কথা বলে ভালো লাগে । ফিরতে একটু দেরি হলো । সন্ধ্যা গড়িয়ে একটু রাত হয়ে গেছে । জ্যাঠামশাই এর ঘরটাতে হালকা আলো জ্বলছে ! ধুপ ধুনোর গন্ধ ।আনমনে ঘরটার দিকে এগিয়ে যায় দামোদর । দরজা হাট করে খোলা। দরজাটা খোলা কেন?বাড়িতে এত লোক তাও একটু খেয়াল করবে না । বিরক্তি নিয়ে এগোয় দামোদর দরজা বন্ধ করতে। ওটা কে বটে? ফাঁকা ঘরে খাঁটো ধুতি পরে লম্বা লম্বা পা ফেলে পায়চারি করছে । স্পষ্ট ছায়া দেখতে পাচ্ছে দামোদর । এবার পা তুলে জ্যাঠামশাই এর খাটে চেপে বসলো। খাটের মচ মচ আওয়াজ পর্যন্ত স্পষ্ট শুনতে পেল দামোদর । অনেক সাহসে ভর করে দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখে খাটে কেউ নেই। কিন্তু পিছনের দেওয়ালে একজন মানুষের খাটে বসে থাকার ছায়া স্পষ্ট । জ্যাঠামশাই খাঁটো করে ধুতি পড়তেন । লম্বা শরীর ছিলো তার।
থর থর করে কেঁপে উঠে দামোদর । তার পা দুটো যেন গেঁথে গেছে মাটিতে ।
রাতে খাবার সময় খোঁজ পরে দামোদরের । খুঁজতে খুঁজতে শেষে জ্যাঠামশাই এর ঘরের মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় তাকে ।
চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলেও এখনও অন্ধকারকে খুব ভয় পায় দামোদর ।
