ঘুমটা ভেঙে গেল। পাশ ফিরে শুয়ে ঘুম চোখে মোবাইলে সময় দেখে ইমন। ভোর পাঁচটা। ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর বিছানায় কিছুক্ষণ চোখ বুঁজে শুয়ে থাকার আরামটা কিছুতেই ছাড়তে পারে না সে। কাচের জানালার পর্দা টানা হয়নি কাল রাতে। সারা ঘর ভরে গেছে আলোয় । দেখে মনে হচ্ছে কত বেলা। ভাদ্র মাসের প্যাঁচ প্যাঁচে গরম। AC চলছে ঘরের ভিতর। বেশ আরামদায়ক ।
খানিকটা সময় এপাশ ওপাশ করে উঠে বসে । দাঁত ব্রাশ করতে করতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিচে রাস্তায় মানুষ জন দেখছে ইমন। কত মানুষ দৌড়চ্ছে, হাঁটছে । আজকাল সবাই কত স্বাস্থ্য সচেতন । নিজের হাত দুটোর দিকে তাঁকিয়ে একটু ভাবে ইমন। যা মুটিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। ভোরে উঠে হাঁটা দরকার কিন্তু ভোর বেলার ঘুমের আরাম ছাড়া মুশকিল তার পক্ষে। রোজ সকালের দৌড় ঝাপ তার দ্বারা হবে না।
ফ্রেশ হয়ে এক কাপ চা খেয়ে বাজারের থলে নিয়ে আজ মর্নিং ওয়াকে রওনা হয় ইমন। পাশের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে রেশমি ঘুমোচ্ছে । মেয়েটা অনেক রাত অবধি পড়ে । দরজাটা টেনে দিয়ে লিফটে চাপলো ইমন।
ভোরের সুন্দর স্নিগ্ধ বাতাসে রাস্তায় হাঁটতে ভালোই লাগছে । এত সকালে এখনও অটো , টোটো পথে বেরোয়নি । নিউটাউনের এই অঞ্চলের রাস্তা ঘাট বেশ পরিষ্কার । হাউজিংয়ের কাছেই একটা বাজার আছে । মোটামুটি কাজ চলে যায় । আজ হাঁটতে হাঁটতে দূরের আঠেরো তলা বাজারেই চলে এলো ইমন । এখানে প্রচুর দোকান ।প্রয়োজনীয় সব জিনিসই পাওয়া যায় । আজ একটু বেশি করে বাজার করে নেবে ঠিক করলো । ফ্রেশ ঝক ঝকে সব্জি দেখে তার মন খুশিতে ভরে উঠলো। পুঁইশাক এক মুঠি ,নানা ধরনের সবজি ফল পছন্দ করে কিনে মাছ মাংসের বাজারের দিকে এগোলো ইমন । বাজারে লোকজন বেশ কম। ভিড়টা এখনও আরম্ভ হয়নি। পরিচিত মাছের দোকান থেকে ছেলেটি এক মুখ হেসে ডাকছে ‘আসুন আসুন দিদি’ । আড় মাছ রেশমীর খুব প্রিয় আর চিংড়ি পছন্দ স্বামীর । কিছুটা আড় আর চিংড়ি নেওয়ার পর চাড়াপোনা খানিকটা নিলো ইমন। তারপর মুরগির মাংস এক কেজি কিনে তার বাজার শেষ হলো। এবার বাড়ী ফিরতে হবে । অটোতে চেপে ব্যাগ ভর্তি বাজার সামলে হাউজিংয়ের সামনে যখন নামলো তখন চওড়া রোদ উঠে গেছে ।
বাজার গুলো গুছিয়ে ফ্রিজে তোলে ইমন । এবার রান্নাটা তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে । ইমনকে ফিরতে দেখে বিকাশ বাবু চা বসিয়ে দিয়েছেন। ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে বসে এবার ডাকাডাকি আরম্ভ করলেন ‘কই গো সবাই এসো’।রেশমি ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে । সারাদিন এই চলবে । রান্না ঘর থেকে মাছ ধুতে ধুতে গলা উঁচিয়ে বিকাশ বাবুকে’আসছি’ বলে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে ইমন কি রে সোনাই , সকালের ব্রেকফাস্ট কি খাবে তুমি ? ল্যাপটপ রেখে রেশমি উঠে এলো । মাকে জড়িয়ে ধরে আবদার করে ‘লুচি আলুর দম খাবো মা’ ।
‘লুচি ,আলুর দম, তারপর দুপুরের রান্না ! ব্রেকফাস্টে কর্নফ্লেক্স খেয়ে নে মা । তোর বাবাও তাই খাক।এত গুলো রান্না করলে আমি নাটকটা নিয়ে বসতেই পারবো না’। ইমন বোঝায় মেয়েকে।
দুর্গা পুজোয় তাদের ব্লকে নাটক হচ্ছে । মহিলা অভিনীত নাটক। সুপরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত একজন পরিচালক মাঝে মাঝে এসে গাইড করছেন ।ভুল ভ্রান্তি ধরিয়ে দিচ্ছেন। বিশাল উত্তেজনা । রিহার্সাল পুরো দমে চলছে । প্রতিদিন বিকেলে জমজমাট ব্যাপার। সংলাপ মুখস্ত রাখা তারপর অভিনয় ।ব্যস্ততা তুঙ্গে ।
সারাদিনের ঘরকন্নার কাজ সেরে দুপুরবেলা একটু সময় নাটকের সংলাপ মুখস্ত করার । শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে নিজের পার্টটা রিহার্সাল দিচ্ছিলো ইমন। দরজায় ধাক্কা ডাকাডাকি শুরু বিকাসবাবু চশমা খুঁজে পাচ্ছেন না। দরজার ছিটকিনি খুলে মুখ বাড়ায় ইমন
কি ব্যাপার ?
‘ চশমাটা কোথায় রাখলাম, দেখেছো তুমি’?
ইমনের স্বামী বিকাশ একটু ভুলো মনের মানুষ ‘কি জ্বালা ‘বলে স্ক্রীপ্ট রেখে বেরোতে হলো তাকে । চশমা খুঁজে পাওয়া গেল । কিছুক্ষন পরে মেয়ে ক্যাচার রেখে গেছে ড্রেসিং টেবিলে তার খোঁজে দরজায় ঠক ঠক। আবার দরজা খোলো । এদের সামনে রিহার্সাল দেওয়া যাচ্ছে না কারণ বাবা মেয়েতে মিলে মুখ টিপে হাসে। এর মধ্যে বিকেলে চায়ের সময় হয়ে গেল । স্ক্রিপ্ট নিয়ে কিচেনে ঢোকে ইমন চা তৈরি করতে করতে চোখ বুলিয়ে নেয়।
সাড়ে পাঁচটা থেকে রিহার্সাল । পাঁচটা বেজে পনেরো মিনিটে বেরিয়ে না পড়লে দেরি হয়ে যাবে । এই দিককার যারা আছেন নাটকে সবাই কমিউনিটি মার্কেটের সামনে জড়ো হওয়ার কথা । কিছুটা এগিয়ে চোখে পড়লো উদিতা, কাবেরী, ছবি, জবা সবাই এসে গেছে। তাদের দিকে হাত নেড়ে তাড়াতাড়ি পা চালায় ইমন।
DA 22 রিহার্সালটা হচ্ছে ।কারণ তাদের গ্যারেজে সিলিং ফ্যান আছে । এই গরমে ফ্যান ছাড়া অসম্ভব। রিহার্সালের জায়গা পরিপাটি করে সাজিয়ে রেখেছে চয়নিকা। ছোটো একটা সেলফে চা বিস্কুট পর্যন্ত রেডি। স্টার্ট স্টার্ট স্টার্ট রিহার্সাল স্টার্ট । এক পাশে স্ক্রিপ্ট নিয়ে প্রম্পটিং করতে অমৃতা বসে পড়লো।
উদিতা নাটকে পরিবারের কর্তার অভিনয় করছে। তার প্রচণ্ড প্রতাপ । যতই চেঁচিয়ে সংলাপ বলুক সবাই বলছে ‘গলা আরো উঠবে ‘। উদিতা মাথা নেড়ে বলে ‘না রে রোজ গার্গল করছি । গলায় ব্যথা হয়ে গেল । আর উঠবে না ‘।
সাথে সাথে জবা গিন্নির অভিনয় সে করছে রায় দিলো ঠিক আছে আমি গলা নামিয়ে নেব তাহলে খাপ খেয়ে যাবে। সবিতার নায়কের রোল সে কিছুতেই সংলাপ মুখস্ত করছে না । প্রম্পটারের দিকে তাকাতে গিয়ে অভিনয় সামলানো যাচ্ছে না । সে রোজ বকা খাচ্ছে । কিন্তু রোজ বকা খেয়েও তার মুখে হাসিটি লেগে রয়েছে। নাটকে নায়িকার অভিনয় করছে ঝুম্পা । সে খুব সিরিয়াস । কিন্তু তার অভিনয়ের মধ্যে একটা গান আছে । ঝুম্পা আবদার করছে তার গলায় সুর কম । এবার স্বপ্না গানটাকে একটু পাল্টে দিলো । সবাই চিৎকার করে সায় দিল ‘এবার দারুন হয়েছে ‘ ।
ছবি, জয়া, সবিতা, শুভ্রা নাটকে পুরুষের অভিনয় করছে। পরিচালক বলে গেছেন পুরুষের অভিনয় যারা করবে তাদের পুরুষের মত হাঁটা চলা হাত নাড়া অভ্যাস করতে হবে । তাই ওরা গ্যারেজে হাঁটা প্র্যাকটিস করছে । ওদের দেখে মাঝে মাঝে দল থেকে রায় দেওয়া হচ্ছে ‘হচ্ছে না হচ্ছে না । ভালো করে খেয়াল করবে কি করে ওরা হাঁটে’। সমবেত হাসির আওয়াজ অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। এর মধ্যে চয়নিকা হাত তুলে বলছে ‘টি ব্রেক ‘ ।
নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার দিন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। এর মধ্যে একদিন মিউজিকের সাথে রিহার্সাল হয়ে গেল । কস্টিউম এবং মেকআপের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা চলছে । হঠাৎ ঝুম্পার শাশুড়ী মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন । ঝুম্পা ফোন করেছে উদিতাকে। বলছে ‘নাটক করা হয়তো হবে না গো আমার । আয়ার উপর নির্ভর করে এতটা সময় বাড়ির বাইরে থাকা হয়তো সম্ভব হবে না’ । খুব খারাপ খবর । সবার মাথায় হাত। ঝুম্পা কে বাদ দিয়ে নাটক নামানো যাবে না। কি হবে এখন!
পরেরদিন মন খারাপ নিয়ে সবাই রিহার্সালে এসেছে । কি করে এই সমস্যার সমাধান করা যায় বুঝতে পারা যাচ্ছে না। আরে গেট খুলে ঝুম্পা ঢুকছে চিৎকার করতে করতে ঢুকছে আমি অভিনয় করে পারবো গো ‘সমস্যা মিটেছে । হাজব্যান্ড ওই সময় বাড়িতে থাকবে বলেছে’। সুতরাং রিহার্সাল শুরু। আনন্দে মেতে উঠেছে সবাই । মেকআপ এবং কস্টিউমের ব্যাবস্থা করার দায়িত্ব উদিতার উপর। তার কাজও অনেকটা এগিয়েছে। মেকআপ করবেন সুজয় মিত্র । সময়মতো চলে আসবেন জানিয়েছেন। কস্টিউম আর প্রপস্ দলের সবার বাড়ী থেকেই জোগাড় হয়ে গেছে। এ দিকটা নিয়ে ভাবনা নেই।
জয়ার অফিসে ক্লোজিং চলছে । সময় মতো রিহার্সালে উপস্থিত হতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে সে। এখন অফিসে ছুটিও করা যাচ্ছে না। ছুটি পাওয়া অসম্ভব। এর মধ্যে শুভ্রার বাড়ির পোষা কুকুর অসুস্থ হয়ে পড়লো।দুদিন রিহার্সালে আসা হলোনা । গুরুত্বপূর্ন রোল তার । পরিচালক সবাইকে নিয়ে একদিন বসলেন। বললেন ‘সবাই খুব সাবধানে থাকুন। সুস্থ থাকুন। খাওয়া দাওয়া সাবধানে করুন। নাটক ভালো হবে ‘। সবাইকে বুস্ট আপ করলেন উনি ।
নাটকের দিন কস্টিউম পড়ে সবার চেহারা পাল্টে গেছে। মেক আপ করতে সুজয়দা এসে গেছেন। রিহার্সালের জায়গায় একটা ঘরের মধ্যে মেক আপ হচ্ছে। মঞ্চও তৈরি হয়েছে এই গ্যারাজেই ।একে একে সবাই মেক আপ নিয়ে বেরুচ্ছে । তাদের দেখে চেনা যাচ্ছে না । পরিচালকের নির্দেশে মঞ্চে নামার আগে দর্শক আসনে চুপ করে বসে আছে তারা। আত্মস্থ করতে চেষ্টা করছে তাদের অভিনীত চরিত্র । মঞ্চের পর্দা সরে গেল। নাটক আরম্ভ। নাটকের দলের সবার দুর্দান্ত অভিনয় এবং ডিসিপ্লিন সব দর্শকের প্রশংসা আদায় করে নিয়েছে। মিউজিক ,লাইটিং অসামান্য হয়েছে ।পরিচালক অভিভূত । সবাই পেশাদার অভিনেতার মত অভিনয় করেছে। দর্শকদের হাততালিতে মুখর চারদিক।
নাটকের শেষে হাসিমুখে নাটকের কুশী লবরা জোড় হাতে মঞ্চ আলো করে দাঁড়িয়ে আছে । এত প্রশংসা পেয়ে তারা আপ্লুত । পরিচালকও মঞ্চে দাঁড়িয়ে নাটকে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে অভিনন্দন জানালেন। এ বছরের মতো অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। আস্তে আস্তে লাইট গুলো নিভে যাচ্ছে।
মঞ্চ অন্ধকার হয়ে গেল। এবার মেক আপ মুছে ঘরে ফেরার পালা।
সমাপ্ত।

খুব ভালো লাগলো,সহজ সরল ভাষায় ব্যবহার গল্পে এক নুতন মাত্রা এনে দিয়েছে। কলম চলুক।
খুব সুন্দর, দারুন,কলম চলুক।
Wonderful. Relatable! The struggles and joys of women in everyday lives!